কাঁটাতারের ওপারে
রোববার সকালে সুকান্ত বনিকের সঙ্গে লম্বা সময় ধরে কথা হল। দু একটি কথার পর তিনি বললেন, ‘আপনার সঙ্গে কথা বলছি আর মনের মধ্যে যে কী হচ্ছে আপনাকে ঠিক বলে বোঝাতে পারব না।‘ এই কথা নতুন কিছু নয়। (হয়তো) কেউ কেউ বলে দেন । মূলত ( হয়তো) তাঁরা এই অধম নির্গুণের অকারণ ‘গুণগ্রাহী’। এবং মহিলা (হয়তো)। (হয়তো) পুরুষের মধ্যে এই সমর্পণের ভাব থাকে না। যদি থাকে তার মধ্যে (হয়তো) একানব্বই শতাংশ (হয়তো) চাটুকার। এসব প্রশস্তি ( হয়তো প্রশস্তি ) শুনলে এখন একটু বোর হয়ে যাই। কিন্তু এ ক্ষেত্রে হলাম না। উল্টএ মনেই হল, উনি যা বলছেন, সেটাই আসল কথা। আমি বুঝতে পারছি কারণ আমারও তাই হচ্ছে। আমি এমন একজনের সঙ্গে কথা বলছি, যিনি আমার শিকড় চেনেন। আমার শোনা অজস্র গল্পের অলিগলিতে তিনি অনায়াসেই যাতায়াত করেন। ফিতে দিয়ে মাপজোক করা আমার পূর্ব পুরুষের ভুখন্ড (যা কিনা মুক্তারাম চৌধুরীর জমিদারির নিষ্কর অংশ) এবং বদলে যাওয়া সেই ভুখন্ডের ইতিহাস—সবকিছুর জ্যান্ত সাক্ষী। আবার সেই ভুখন্ড—মানে সেই ধুলো, সেই মাটি, এক ইতিহাস, কত মিথ, আর কত শত ভুলে যাওয়া সাধারণ দৈনন্দিন গল্পের একজন অসাধারন রক্ষক। তিনি বলছিলেন, আমি শুনছিলাম। ফেলে যাওয়া একটুকরো ভুখন্ডের বিবর্তনের গল্প। প্রথমে শত্রু সম্পত্তি। তারপর দখলদারি। তারপর কোর্ট কাছারি। তারপর এলাকার মানুষের প্রতিরোধ। শেষে এই এক টুকরো টিকে যাওয়া... ভাগ বাঁটোয়ারার পৃথিবীতে টিকে থাকা সত্যি বড্ড কঠিন একটা কাজ।
ভাবছিলাম এবার বোধহয় তিনি সেই জামরুল গাছটার কথা তুলবেন। গল্পে
শোনা সেই গাছ আমি শুধু স্বপ্নে দেখেছি। স্পষ্ট
দেখেছি। এক ঝাঁক টিয়াপাখি উড়ে এলো। কোন দেশ থেকে কে জানে? হয়ত তিনি বলবেন, সেই জামরুলগাছটা
এখনও আছে, জানেন তো! প্রচুর টিয়াপাখি আসে। আপনাদের নাম করে ডাকাডাকি
করে। বা হয়ত বলবেন, সেই ইঁদারাটা এখনও আছে। কেঁদে কেঁদে সব জল শুকিয়ে গেছে। এখন অন্ধ
চোখে শুধু হাঁ করে চেয়ে থাকে। আসুন এবার একবার দেখে যান। ওঁর সঙ্গে কথা বলছি আর
ভাবছি, বাধানো লাল সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলে ডান হাতে যে নতজানু জি হুজুর হাসনুহানা—এবার
তার কথা হোক না! হাসনুহানার গভীরে সরু ডাল জড়িয়ে ঘুমিয়ে থাকা
কালনাগিনীটা কোন দেশের নাগরিক? কে তাকে বসবাসের ছাড়পত্র দিয়েছিল? ঠাকুমা সে কথা
বলতে ভুলে গেছে। এবার জেনে নেব...
সুকান্তবাবু আমাকে একটা ‘স্মরণিকা’ লিখতে বলছেন। আমি বলছি লিখব। কিন্তু অন্তর্যামীর চোখে টলটলে জল। সেই কান্না গোপন করার তালে সে একটা ছোট সাইজের মেঘ হয়ে ধীরে ধীরে চলে যাচ্ছে বর্ডার পেরিয়ে, বিনা পাসপোর্টে। স্বদেশ-বিদেশ, ঘর-বার এই সব হিসাব গুলিয়ে ফেললে কি চলে? ব্যাপারটা কিন্তু ঠিক হচ্ছে না। অন্তর্যামী মশাই ফিরে আসুন।



Comments
Post a Comment